ধন্যবাদনামা।


ছোট একটু সুন্দর কথা থেকে আন্তরিকতার সৃষ্টি হতে পারে। মানুষ আপনার থেকে কি চায়? একটু ভালোবাসা, একটু সুন্দর আচরন, একটু সম্মান। 


আমি বাড়িতে আসলে কখনোই চুল কাটিনা। আম্মু সকাল বিকাল রাত বলতে বলতে ক্লান্ত হয়ে একসময় বলাই বাদ দিয়ে দেন। এইবার আসার আগেই আম্মু বলতেছিলো,"ওখান থেকে চুল কেটে আসো। তুমিতো আবার অন্য কোথাও চুল কাটোনা।"


আমি যতবারই সেলুনে যাই সবসময় লোকটা আমাকে আলাদা ভাবে ট্রিট করেন। আমার অবস্থা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করেন, ভালোমন্দ খবর নেন। আমার মনে আছে হয়তো দুই বছর আগে প্রথম যখন আমি সেলুনে চুল কাটতে যাই আমি আড্ডা বাজ হওয়ায় পুরোটা সময় তার কথা শুনি। তার দুঃখ কষ্টে সহানুভূতি দেখাই, টাকা দেওয়ার পর সুন্দর করে কাটানোর জন্য ধন্যবাদ জানাই। তখন থেকেই আমি যতবার ওই সেলুনে গেছি তিনি সবসময় আমাকে ভিন্নরকম এক ট্রিট করেছেন যা আমাকে বারবার সেখানে নিয়ে গিয়েছে। আমাকে বাধ্য করছে তাকে ধন্যবাদ দিতে। 


আমি নিয়মিত এক দোকানে মুদি বাজার করতাম। যখনই ছেলেটা যাবতীয় জিনিসপত্র মেপে দিতো আমি ছেলেটাকে ধন্যবাদ দিতাম। ছেলেটার সুন্দর হাসি আমাকে মুগ্ধ করতো। একদিন আমি আমার চশমাটা পরে না যাওয়ায় বলতেছে,"ভাই আপনাকে সাদা চশমাটাতে ভালো লাগে। চশমা পরেন না কেনো?" আমার তেমন একটা বাজার করা হয়না। কিন্তু এই ব্যস্ততার শহরে ছেলেটি প্রতিদিন শতশত মানুষের মধ্য আমাকে মনে রেখেছে তা আমার ভেতরে আনন্দের সৃষ্টি করে। আমি যে সবার থেকে ইকটু স্পেশাল তা আমাকে চমৎকার অনুভূতি দেয়। 


আমি নিয়মিত একটি দোকানে টাকা ক্যাশআউট করি।প্রতিবার টাকা নেওয়ার সময় লোকটাকে আমি ধন্যবাদ দেই। আমি হটাৎ একদিন খেয়াল করলাম যে আমি নির্দিষ্ট টাকা ক্যাশআউট করেছি বলার সাথে সাথেই না দেখেই তিনি আমাকে টাকাটা দিয়ে দিলেন। সেদিন আমি পুলকিত হয়েছিলাম। আমি ভাবছিলাম শুধু ইকটু ধন্যবাদ, ইকটু শ্রদ্ধা মানুষকে ভালো মানুষের কাতারে ফেলে দিতে পারে। আপনার প্রতি ট্রাস্ট বাড়াতে সাহায্য করতে পারে।


আমি লেখাটা লিখতে চেয়েছিলাম বছর খানেক আগে। যতটুকু মনে পরে আমার পরিচিত কাছের একজন ফেসবুকে তৎকালিন ভাইরাল একটি টপিকে "রিকসাওয়ালাদের ধন্যবাদই দেওয়া উচিত না" এমন একটি পোস্ট করেন তার পরিপ্রেক্ষিতে একটি কমেন্ট করি যা পরবর্তীতে পোস্ট করার ইচ্ছা জাগে। তিনি রিকসাওয়ালাদের খারাপ আচরণ ও তার অভিজ্ঞতায় হয়তো অসন্তুষ্টি প্রকাশে এটা লিখেছিলেন। কারো খারাপ আচরনে সত্যিই আমরা দুঃখ পাই। কিন্তু আমাদের ছোট ছোট ভালো আচরণ যে আমাদের চারপাশে আমাদের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করে। আমাদের জীবনে দারুন প্রশান্তি এনে দিতে পারে সেটাও অস্বীকার করার কোনো অবকাশ নেই।


আমি যে কি পরিমান ভুলমনা তা উপলব্ধি করলেও এতটা ভুলমনা সেটা জানা ছিলোনা।


আড়াই বছর আগে (জানুয়ারি,২০২২) বাড়িতে আসার সময় হটাৎ বাসে অসুস্থ হয়ে পড়ি। বমি করছিলাম। আমি আগেই বলেছি আমি আড্ডাবাজ মানুষ। দুজন সিভিল ড্রেসে পুলিশ সদস্যর সাথে আমার পরিচয় হয়। তারা আমাকে সাহায্য করার চেষ্ঠা করেন। একজন সদস্য বাসের হেল্পারকে পানির কথা বলায় হেল্পার আমাকে বকাঝকা করতে থাকে এতে উনারা দুজন ক্ষেপে যান। পরবর্তী পুলিশ বক্সে বাস থামিয়ে হেল্পারকে ভেতরে নিয়ে যান (কি করেছে জানিনা)। পুরো রাস্তায় আর হেল্পারকে কথা বলতে দেখিনি। আমার মনে আছে আমি যখন বমি করছিলাম তখন পুলিশ ভাইটির জ্যাকেটেও লেগে যায়। তবুও তারা বলতেছিলো আমার বেশি খারাপ লাগছে কিনা, আমি ঠিক আছে কিনা। MD Fakrul Islam Fahiem ভাই আপনি সহ আপনার পাশের ওই পুলিশ ভাইটিকে ধন্যবাদ জানাই। আপনারা পুলিশ বাহিনীর গর্ব। যারা সত্যিই দেশের জন্য কাজ করেন, দেশকে প্রাণ দিয়ে ভালোবাসেন। 


আমার হয়তো বেশিরভাগ ঘটনা হয়ে যাচ্ছে বাড়ি যাওয়া কেন্দ্রীক। গতকালের পোস্টটা পুনরায় লিখতে মনোযোগী হওয়ার কারন হলো যেদিন বাড়িতে চলে আসবো সকালে একটি ছোট দোকানে নাস্তা করার জন্য ঢুকি। নাস্তা করতে করতে দোকানদারের সাথে দেশের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে হাসিঠাট্টা করি। দ্রুত নাস্তা শেষ করে বের হয়ে সিএনজিতে যখন উঠছিলাম। হটাৎ পেছন থেকে,"ভাই ভাই আপনার ফোন" দোকানদারকে দৌড়িয়ে আসতে দেখি। আমি গাড়ির জন্য রাস্তা পার হতে পারতেছিলাম না। উনি রাস্তা পার হয়ে আমার হাতে ফোনটা ধরিয়ে দিলেন। মুখে হাসি নিয়ে ধন্যবাদ জানিয়ে সিএনজিতে উঠে পড়ি।


এইদিনে যখন ফেসবুকে নেগেটিভ কথার ভিড়ে টেকা যাচ্ছেনা তখন এইসব মানুষই আমাদেরকে সুন্দর একটি সমাজ গঠনে ভূমিকা রাখতে পারে। আমি জানিনা তিনি কতটুকু পড়ালেখা করেছেন। আমি অনেক প্রতিষ্ঠানিক শিক্ষিতদের দেখেছি যাদের নৈতিকতা তলানিতে। ফোনটার কথা অস্বীকার করলে হয়তো পোস্টটাও দিতে পারতাম না। তাকে আবারো ধন্যবাদ জানাই। পৃথিবীর সব মানুষ সুখি হোক। নৈতিকতায় ভরে উঠুক সমাজ। তাহলেই হয়তো শান্তি আসতে বাধ্য।


© মোস্তাফিজুর রহমান

মন্তব্যসমূহ

জনপ্রিয় পোস্টসমূহ